মাত্র কয়েকজনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, প্রচার-প্রচারণার অভাবে ক্ষুব্ধ নারী সংগঠকরা
তৌফিকুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার:
‘শিশু বিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের এমন তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নাটোরের বাগাতিপাড়ায় পালিত হয়েছে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস-২০২৬। তবে দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে মাত্র কয়েকজনের উপস্থিতিতে আয়োজন সম্পন্ন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। গুরুত্বপূর্ণ একটি জাতীয় দিবসের আয়োজন কেন এতটা দায়সারাভাবে করা হলো, তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল ১০টায় বাগাতিপাড়া উপজেলা পরিষদের বড়াল সভাকক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের ব্যানারে ‘বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান’ উল্লেখ থাকলেও র্যালিতে অংশগ্রহণকারী ও উপস্থিতির সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির এ আয়োজনের এমন চিত্রে হতাশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
একজন নারী সংগঠক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে দেখি অনুষ্ঠান হচ্ছে। তাই দাঁড়িয়ে পড়েছি। আমাদের কোনো অনুষ্ঠানেই জানানো হয় না। নারী সংগঠক হিসেবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারতাম। এভাবে অনুষ্ঠান করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে কীভাবে?”
এ ঘটনায় উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শিরিনা আক্তারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তাঁদের অভিযোগ, যথাযথ প্রচার-প্রচারণা, নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় দিবসটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে, ওই কর্মকর্তার আচরণ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা। তাঁর দাবি, সম্প্রতি কোলে শিশুসন্তান থাকায় এক নারীকে মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কক্ষে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয় এবং তাঁর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা হয়। ওই নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, নারীটিকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছিল, “এটা কি আপনার বাবার বাড়ি, যখন-তখন যেভাবে খুশি ঢুকবেন? এটা সরকারি অফিস।”
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এর আগেও সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানারে শেখ হাসিনার স্লোগান ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল এবং এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা। এসব অভিযোগের পরও দৃশ্যমান জবাবদিহি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে বলে দাবি তাঁদের।
সচেতন মহলের প্রশ্ন, নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নারীর ক্ষমতায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি দপ্তরের আয়োজনে যদি সংশ্লিষ্ট নারী সংগঠক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে সরকারি অর্থ ও আয়োজনের কার্যকারিতা কতটুকু? জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান কি কেবল ব্যানার টাঙিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করার জন্য, নাকি এর মাধ্যমে বাস্তবিক অর্থে জনসচেতনতা তৈরির দায়িত্বও রয়েছে?
জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের মূল লক্ষ্য যেখানে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সেখানে এমন সীমিত পরিসরের আয়োজন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
তাঁদের দাবি, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ, নারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং পূর্বের অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শিরিনা আক্তারকে ফোন দিলেও কোন মন্তব্য করেননি ।
