লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:
সড়কের পাশে ছোট্ট একটি ঢোপঘর। সামনে কয়েকটি বিস্কুটের প্যাকেট, চায়ের কেটলি আর নিত্যদিনের ব্যস্ততা। দোকানটি এতটাই ছোট যে, দু-একজন দাঁড়িয়ে চা খেলেই ভেতরের জায়গা ফুরিয়ে যায়। তাই চা-বিস্কুট কিনে অনেক পথচারীকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তা শেষ করতে হয়।
চকবাদকয়া মোড়ের এই ছোট্ট চায়ের দোকানটিই মাতুয়ারা বেওয়ার কাছে শুধু একটি দোকান নয়—এটাই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন।
স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁকেই। নিজের বলতে বড় কোনো সম্পদ নেই, নেই নির্ভর করার মতো কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস। প্রতিদিন সকালে দোকান খুলে বসেন। চা বানান, বিস্কুট বিক্রি করেন। দিন শেষে যা আয় হয়, তা নিয়েই চলে সংসার।
জীবনের হিসাবটা তাঁর কাছে খুব সরল—দোকান খুললে আয় হবে, আয় হলে ঘরে খাবার উঠবে। আর দোকান বন্ধ থাকলে থেমে যাবে সেই সামান্য আয়ের পথও।
বিলমাড়ীয়া-ভেল্লাবাড়ীয়া সড়কের চকবাদকয়া মোড় দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। তাঁদের কাছে সড়কের পাশে থাকা এই ছোট্ট দোকানটি হয়তো খুব সাধারণ একটি চায়ের দোকান। কিন্তু মাতুয়ারার কাছে এর প্রতিটি টিনের চাল, প্রতিটি চায়ের কাপ আর বিস্কুটের প্যাকেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনসংগ্রাম।
দোকানের জায়গা সংকীর্ণ হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে পথচারীদের বসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কেউ চা খেতে চাইলে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। মাতুয়ারার নিজেরও হয়তো সামর্থ্য ছিল না দোকানের পাশে আলাদা করে বসার জায়গা তৈরি করার।
এই বাস্তবতার মধ্যেই গত শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেন বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ও জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলহাজ্ব আনেজ উদ্দিন।
মাতুয়ারার দোকানের পাশে পথচারীদের বসার জায়গা তৈরির জন্য তিনি দেন ঢেউটিন, সিমেন্টের তৈরি খুঁটি ও নগদ অর্থ। ছোট্ট সেই সহায়তা এখন মাতুয়ারার জন্য নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
দোকানের পাশে বসার জায়গা হলে পথচারীরা সেখানে কিছুক্ষণ বসে চা খেতে পারবেন। আর সেই সঙ্গে বাড়তে পারে মাতুয়ারার ছোট্ট ব্যবসাটির ব্যস্ততাও।
সহায়তা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন যুব জামায়াতের সভাপতি মাওলানা রাকিবুল ইসলামসহ স্থানীয় জামায়াতের নেতৃবৃন্দ।
তবে এই গল্পের মূল চরিত্র কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়; মূল চরিত্র একজন স্বামীহারা নারী, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে যাননি।
মাতুয়ারার প্রতিদিনের জীবন খুব সাধারণ। দোকানের সামনে বসে থাকা, চায়ের পানি ফুটানো, কাপ ধুয়ে রাখা, পথচারীর ডাক শুনে চা এগিয়ে দেওয়া—এই ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েই কেটে যায় তাঁর দিন।
কখনো হয়তো দোকানে ক্রেতা বেশি, কখনো দীর্ঘ সময় বসে থেকেও তেমন বিক্রি হয় না। তবু দোকান খুলে বসতেই হয়। কারণ এই দোকানটিই তাঁর স্বাবলম্বী থাকার শেষ অবলম্বন।
স্বামীর মৃত্যুর পর অনেকের জীবনেই নেমে আসে অনিশ্চয়তা। মাতুয়ারার জীবনেও এসেছে। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার কাছে হার না মেনে তিনি বেছে নিয়েছেন পরিশ্রমের পথ। একটি ছোট্ট দোকানকে কেন্দ্র করেই গড়ে তুলেছেন নিজের বেঁচে থাকার লড়াই।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দোকানের পাশে বসার জায়গা তৈরি হলে পথচারীদের সুবিধা হবে। একই সঙ্গে মাতুয়ারার ব্যবসায়ও কিছুটা গতি আসতে পারে। হয়তো প্রতিদিনের আয় খুব বেশি হবে না, কিন্তু একজন মানুষের জীবনে সামান্য বাড়তি আয়ও অনেক বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে।
চকবাদকয়া মোড় দিয়ে যাঁরা যাতায়াত করেন, তাঁদের কাছে হয়তো মাতুয়ারা বেওয়ার দোকানটি আর দশটি চায়ের দোকানের মতোই। কিন্তু একটু থেমে তাকালে দেখা যায়—এই ছোট্ট দোকানের আড়ালে লুকিয়ে আছে একজন নারীর দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।
একটি চায়ের কাপে হয়তো থাকে সামান্য চা, চিনি আর দুধ। কিন্তু মাতুয়ারার সেই চায়ের কাপের সঙ্গে মিশে আছে ঘাম, অভাব, স্বপ্ন আর টিকে থাকার চেষ্টা।
জীবন বদলে দেওয়ার জন্য সবসময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি টিন, কয়েকটি খুঁটি কিংবা সামান্য কিছু অর্থও একজন মানুষের জন্য হয়ে উঠতে পারে নতুন করে পথ চলার সাহস।
চকবাদকয়া মোড়ের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানটি তাই শুধু চা-বিস্কুট বিক্রির জায়গা নয়। এটি একজন নারীর একা হাতে জীবনকে টেনে নেওয়ার গল্প—আর মানুষের পাশে দাঁড়ালে ছোট্ট উদ্যোগও যে কারও জীবনে একটু স্বস্তির ছায়া হয়ে উঠতে পারে, তার নীরব সাক্ষী।
